সিরাজগঞ্জের চৌহালী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলার ঘোড়জান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান রমজান আলীর দৌরাত্ম এখনো থামেনি। তার বিরুদ্ধে একাধিক দূর্নীতির অভিযোগ থাকলেও ক্ষমতার দাপটে কখনো বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রমজান আলীর বিরুদ্ধে ভিজিডির চাল বিতরণকালে কার্ডধারী ৩৬৮ জন দুস্থ মানুষের কাছ থেকে ট্যাক্সের নামে ১০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল। জানা যায়, সেই সময় ঘোড়জান ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন চর জাজুরিয়া এলাকার যমুনা নদীরঘাটে দুই দিন নদীর মধ্যে নৌকার ওপর চাল রেখে বিতরণ করা হয়। এ ইউনিয়নের ৩৬৮ জন কার্ডধারীদের মাঝে ২০২৩ সালের জুলাই ও আগাস্টের ভিজিডির ২ বস্তা (৬০কেজি) চাল বিতরণের সময় প্রতি জন উপকারভোগীর কাছ থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করা হয়। কিন্তু এ টাকার কোনো রশিদ প্রদান করা হয়নি।

পরে স্থানীয়রা এ বিষয়ে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ দিলে নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগের সত্যতা পান এবং রমজান আলীকে দুই দিনের জন্য বরখাস্ত করেন। অভিযোগ আছে, রমজান আলীর ভাগিনা সূর্য মিয়া তার সকল অপরাধ সম্পাদন করে থাকে । বিষয়টি এলাকায় প্রায় ওপেন সিক্রেট হিসেবে পরিচিত। সূর্যের কারণে ধূর্ত রমজান দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সূর্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে চাল চুরির ঘটনার সংবাদ প্রকাশের পর থেকে সে পলাতক রয়েছে বলে জানা যায়। এ ঘটনায় তার ভাগিনা সূর্য মিয়ার নামেও একটি মামলা চলমান রয়েছে, যার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

শুধুমাত্র চেয়ারম্যানই নন, রমজান আলীর আরো একটি পরিচয় আছে। স্থানীয় চরধীতপুর দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক পদে থাকলেও প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেননা এই রমজান চেয়ারম্যান। তিনি কখনো মাদ্রাসায় যান না, ক্লাসও নেননা তবে মাসে মাসে বেতন তুলে নেন ঠিকই। অর্থাৎ একই সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে মাসিক বেতন ও চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারী সম্মানী গ্রহন করছেন।
তবে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ফেনালাপে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে সব মিথ্যা বলে দাবী করেন।
যদিও তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে তার স্থায়ী ঠিকানা মুরাদপুর হলেও বর্তমানে ঘোরজান ইউনিয়নের চর জাজুরিয়া এলাকায় বসবাস করছেন আর মাদ্রাসাটির অবস্থান চরধীতপুরে। তবে তিনি চরধীতপুরে বসবাস করেন বলে প্রতিবেদকের কাছে মিথ্যা দাবী করেন।
চৌহালি থানা আওয়ামি লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যন ফারুক সরকার ও সাবেক ফ্যাসিস্ট আওয়ামি সরকারের সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হিসাবে এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী রমজান আলীর এইসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও তার বিরুদ্ধে মুখ খুলার সাহস পায়না কেউ। এমনকি এ বিষয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন ধরেননি।
অধ্যক্ষ ফোনে সাড়া না দিলেও পরবর্তীতে সহকারী সুপার মোঃ গনির সঙ্গে ফোনালাপে তিনি রমজান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, সংক্রান্ত ঘটনাটি সত্য বলে দাবি করেন।
ফোনালাপে তিনি বলেন, রমজান আলী নিয়মিত মাদ্রাসায় উপস্থিত হন না এবং কোনো ক্লাসও নেন না। তবে প্রতি মাসে তিনি শিক্ষক হিসেবে বেতন উত্তোলন করে থাকেন। এ বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার পরিবর্তে একজন বদলি শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে রাখা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরো বলেন, একই ব্যক্তি একদিকে শিক্ষক হিসেবে মাসিক বেতন এবং অন্যদিকে চেয়ারম্যান পদে সরকারি সম্মানী গ্রহণ করছেন, যা সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার লঙ্ঘন।
তবে অচিরেই তার বিরুদ্ধে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানাবেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক। কিন্তু প্রশ্ন আওয়ামি সরকারের পতন ঘটলেও কোন খঁটির জোরে রমজান আলী থেকে গেছেন ধরাছোয়ার বাইরে?
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর স্থানীয় আওয়ামি লীগ নেতা কর্মিরা এলাকা ছেড়ে পালালেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করে রমজান আলী আছেন বহাল তবিয়তে।
এই বিতর্ক রমজান আলীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি স্থানীয় স্বচ্ছন্দতা ও জবাবদিহি বিষয়ক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

