ভুয়া বিদ্যুৎ মামলায় একটি পরিবারকে পুলিশ দিয়ে চরম হয়রানি করা হয়েছে। গভীর রাতে বাড়ি ঘেরাও করে দরজা ভেঙে কথিত আসামিকে গ্রেফতার করতে পুলিশও চরম বাড়াবাড়ি করেছে। শেষমেষ পুলিশকে ঘুস দিয়ে রাতের গ্রেফতার অভিযান থেকে ভুক্তভোগী রক্ষা পায়। ততক্ষণে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যায়। সম্মানী ব্যক্তি সম্মান হারায়। বিব্রত হতে হয় সমাজের কাছে। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের তারাকান্দায়।
হয়রানিমূলক সাজানো এ ঘটনার পেছনে এলাকার একটি চক্র জড়িত। যাদের হয়ে টাকার বিনিময়ে ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের ফুলপুরস্থ কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী মহলের।
জানা যায়, তারাকান্দা উপজেলার পঙ্গুয়াই গ্রামের সর্বজন পরিচিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য এমদাদুল হকের নামে বিউবো-এর অধীন একটি বিদ্যুৎ সেচ লাইন রয়েছে। যার হিসাব নং- ৬০০২, গ্রাহক নং ৭৫৬৬৭২৭৮। সেচ লাইনটিতে ৪৯ হাজার ৮০৬ টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ্ বাদি হয়ে গত ১৫ জুন ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ আদালতে মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নম্বর নং-৮৩৫/২৫। মূলত ওই সময় মিটার গ্রহীতা এমদাদুল হক ক্যানসারে আক্রান্ত তার বড় ছেলের চিকিৎসা নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি তার সন্তান অনিককে (৩০) বাঁচাতে পারেননি। ১৭ জুন অকালে বড় ছেলেকে হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। মাছের ঘেরের কাজে সময় দিতে পারেননি। তবে এমদাদুল হক দায়েরকৃত মামলার সমন পেয়ে ১৯ আগস্ট ধার্য তারিখের আগেই টাকা পরিশোধ করে প্রত্যয়নপত্র নেন। এরপর যথারীতি তার বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করে দেওয়া হয়।
এদিকে গত ৪ নভেম্বর রাত ২টার দিকে দিকে তারাকান্দা থানা পুলিশের একটি দল এমদাদুল হককে গ্রেফতার করতে তার বাড়িতে আসে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করার মামলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে গ্রেফতারি পরওয়ানা আছে। এমদাদ পুলিশকে জানান, তিনি বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছেন এবং এ বিষয়ে তার কাছে প্রত্যয়ন পত্র রয়েছে। তার মাছের ঘেরে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু আছে। কিন্তু পুলিশ কোনো কথা শুনতে নারাজ। দরজা না খুললে ভেঙ্গে গ্রেফতার করা হবে। এ সময় আশপাশের বাড়ি থেকে লোকজন জড়ো হয়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিশ টিমে নেতৃত্ব দেওয়া এসআই দেলোয়ার হোসেনকে তার চাহিদামাফিক টাকা দেওয়া হলে তিনি গ্রেফতার থেকে বিরত হন এবং বকেয়া বিল পরিশোধ করে থানায় গিয়ে দেখা করতে বলে যান।
এ সময় পুলিশের কাছ থেকে এমদাদুল হক আরও একটি মামলা দায়েরের খবর জানতে পারেন। প্রাপ্ত কাগজপত্রে দেখা যায়, ১৫ জুন প্রথম মামলাটি করার মাত্র ৩ দিনের মাথায় ১৮ জুন একই কর্মকর্তা এম এম আসাদ উল্লাহর স্বাক্ষরে আরও একটি মামলা করা হয়েছে। যেখানে একই মিটারে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল দেখানো হয় ৪৯ হাজার ৭৯৬ টাকা। মামলা নং ১০০৬/২৫। অথচ এ অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন।
এদিকে একই মিটারের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানে এভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করার কারণ জানতে চাইলে সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ যুগান্তরের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতে চাননি।
তিনি ক্ষুদেবার্তা লিখে জানান, তিনি এখন এ অফিসে কাজ করছেন না। বিষয়টি নিয়ে তার সহকর্মী সহকারী প্রকৌশলী আল আমিনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এছাড়া যেহেতু বিচারাধীন বিষয়, তাই তিনি কথা বলবেন না।
কেন তিনি এভাবে ভুয়া মামলা দায়ের করে পুলিশ দিয়ে মিটার গ্রহীতাকে হয়রানি ও সম্মানহানী করলেন- জানতে চেয়ে ক্ষুর্দে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী প্রকৌশলী আল আমিন যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের ভুল হয়েছে। এছাড়া ভুলটি করেছেন সাবেক সহকারী প্রকৌশলী এম এম আসাদ উল্লাহ। তিনি এখন চট্টগ্রামে কর্মরত।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টি জানার পর আমরা বিব্রতবোধ করছি। পিডিবির সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে।’
ফুলপুর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের প্রকৌশলী মো. মোফাজ্জল হোসেন জানান, ‘উনার বিরুদ্ধে একই মামলার কাগজ ভুলবশত দুইবার চলে যাওয়ায় দুইটি মামলা হয়ে গেছে। বিষয়টি জানার পর প্রত্যয়নপত্র পাঠিয়ে মামলার সমন্বয় করে দিয়েছি। অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।’
ভুক্তভোগী এমদাদুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি পড়ে গিয়ে পা ভাঙ্গা অবস্থায় বাড়িতেই আছি বেশ কিছুদিন। কোথাও চলাফেরা তেমন করতে পারছি না। এর আগে আমার সন্তানকে হারিয়েছি। এরমধ্যে আমাকে এভাবে হেনস্তা করা হলো!’
তিনি বলেন, ‘কেন আমাকে মিথ্যা মামলায় হেনস্তা করা হলো, জীবনে কোনদিন আমাদের বাড়িতে পুলিশ আসেনি। এ ঘটনায় আমার পরিবারের সম্মানহানি হয়েছে। এটার প্রতিদান কী শুধু ক্ষমা চাওয়া? কোনো ক্ষমা হবে না। আমি জড়িতদের প্রত্যেকের যথাযথ শাস্তি দাবি করছি। প্রতিকার না পেলে মামলা করব।’
গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া তারাকান্দা থানা পুলিশের এসআই দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাকে এ বিষয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

