নেত্রকোনা আজ ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ। যখন দেশজুড়ে নতুন বছরকে বরণের উৎসব চলছে, তখন নেত্রকোনা সদর উপজেলার মৌগাতি ইউনিয়নের কাঞ্চনপুরসহ ২৫টি গ্রামের আকাশে-বাতাসে বইছে শোকের মাতম। উৎসবের এই দিনটি এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এক দুঃসহ স্মৃতির নাম। আজ থেকে ঠিক ২২ বছর আগে, ২০০৪ সালের এই দিনে মাত্র এক মিনিটের এক প্রলয়ংকরী টর্নেডো লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল সাজানো এক জনপদ। ইতিহাসে যা ‘কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডি’ হিসেবে পরিচিত।
উৎসবের সন্ধ্যায় নেমেছিল মৃত্যুর ছায়া
সেদিনও ছিল নববর্ষের দিন। গ্রামবাসী যখন নতুন পোশাক আর আত্মীয়-স্বজনের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই গোধূলি লগ্নে পশ্চিম আকাশে দেখা দেয় এক অদ্ভুত লাল আভা। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাত্র ৬০ সেকেন্ডের এক তাণ্ডব সব শেষ করে দেয়। ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে যায়, উপড়ে পড়ে শত শত গাছ। এমনকি ভাওয়াল বিলের পানি পর্যন্ত শূন্যে উঠে গিয়ে ছিটকে পড়ে দূরের জমিতে। বিলের মাছ পাওয়া গিয়েছিল আধা কিলোমিটার দূরে।
লাশের মিছিল আর অলৌকিক বেঁচে ফেরা
ঝড়ের তাণ্ডবে নারী ও শিশুসহ প্রাণ হারান শতাধিক মানুষ। সেদিনের সেই বিভীষিকা বর্ণনা করতে গিয়ে এখনো শিউরে ওঠেন স্থানীয়রা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে:
কারো পাওয়া গিয়েছিল মস্তকবিহীন মরদেহ, কেউ আবার নিজ গ্রাম ছেড়ে ছিটকে পড়েছিলেন কয়েক কিলোমিটার দূরে।
এক দুধের শিশুকে তিন দিন পর ধানখেত থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল, যা এলাকায় অলৌকিক ঘটনা হিসেবে পরিচিত।
কৃষক হাদিস মিয়ার দুই বছরের মেয়ে তাসলিমা ঘরের ধরনার নিচে বালিশ চাপা পড়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়।
কনে দেখতে এসে ওই দিন প্রাণ হারিয়েছিলেন পাত্রপক্ষের লোকজনও।
ভুলতে না পারা সেই ক্ষত
দীর্ঘ ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও স্থানীয়দের মনে সেই আতঙ্ক এখনো কাটেনি। গ্রামের বাসিন্দা হেলাল মিয়া বলেন,
“এখনো পশ্চিম আকাশে কালো মেঘের সাথে লাল আভা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। মনে হয়, আবার বুঝি ফিরে আসছে সেই ভয়াল সন্ধ্যা।”
তৎকালীন ইউপি সদস্য নজরুল ইসলামের মতে, সেদিনের ধ্বংসযজ্ঞ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, উদ্ধারের সময় চেনার উপায় ছিল না কে জীবিত আর কে মৃত।
ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
দুই দশকে কাঞ্চনপুরের দৃশ্যপট বদলেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, এসেছে বিদ্যুৎ ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এখন এখানকার মানুষ অনেক বেশি সচেতন। তবে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও শোকের সেই ক্ষত মুছে যায়নি।
দিবসের কর্মসূচি
প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটি উপলক্ষে কাঞ্চনপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে পালিত হচ্ছে শোক দিবস। নিহতদের স্মরণে স্থানীয় মসজিদগুলোতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
কাঞ্চনপুর ট্র্যাজেডি কেবল একটি দুর্যোগের নাম নয়, এটি শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার এক অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক।

