চারপাশের মানুষ যখন স্বাভাবিক জীবনে ব্যস্ত, পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখ-দুঃখের জীবন কাটাচ্ছেন, তখন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার জিরুয়া গ্রামের আবুল হোসেন মামুনের দিন কাটছে অন্ধকার ঘরের এক কোণে পায়ে লোহার শিকল আর তালাবদ্ধ অবস্থায়। মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর দীর্ঘ ছয় বছর ধরে এভাবেই বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
জানা যায়, সেনবাগ উপজেলার জিরুয়া গ্রামের দিনমজুর মো. হানিফ মিয়ার বড় ছেলে আবুল হোসেন মামুন (৩৮)। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। একসময় তিনি ছিলেন স্বাভাবিক, মেধাবী ও চঞ্চল। বিয়ে করে সংসারও গড়েছিলেন এবং দুই সন্তানের জনক হন। তবে মানসিক অসুস্থতা দেখা দেওয়ার পর তার সংসার ভেঙে যায়। দুই সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী অন্যত্র চলে গিয়ে নতুন সংসার শুরু করেন।
স্থানীয় ও প্রতিবেশী সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর আগে হঠাৎ করেই মামুনের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। কোনো কারণ ছাড়াই তিনি হিংস্র হয়ে উঠতেন, ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতেন এবং আশপাশের মানুষকে আঘাত করার চেষ্টা করতেন। প্রথমদিকে পরিবার বিভিন্ন কবিরাজি ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি।
পরবর্তীতে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং প্রতিবেশীদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ালে, বাধ্য হয়ে পরিবারের সদস্যরা তার পায়ে শিকল পরিয়ে দেন। এরপর থেকেই টিনের ঘরের এক কোণায় বন্দি জীবন কাটছে তার।
মামুনের বাবা হানিফ মিয়া একজন দিনমজুর। নিত্যদিনের সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে উন্নত মানসিক চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে অর্থের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবঞ্চিত রয়েছেন মামুন।
মামুনের মা রেশমা আক্তার কহিনুর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “কোনো মা-বাবা চায় না নিজের সন্তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে। বুকটা ফেটে যায়। কিন্তু ছেড়ে দিলে সে মানুষের ক্ষতি করে, আবার বাইরে গিয়ে হারিয়েও যায়। আমাদের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই।”
বাবা হানিফ মিয়া বলেন, “ভালো কোনো মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো আমার ছেলে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারত। যা ছিল সব দিয়েই চেষ্টা করেছি। এখন আর কোনো উপায় নেই। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারের কাছে ছেলের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা চাই।”
এ বিষয়ে সেনবাগ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা উপনাস চন্দ্র দাস বলেন, “আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। মামুনের বিষয়টি জানার পর ইউনিয়ন সমাজকর্মীকে খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তাকে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং সরকারি সহায়তার বিষয়টিও দেখা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে মামুনের মতো একজন অসহায় মানুষ নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ পেতে পারেন।

