উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। যমুনার তীব্র ভাঙনে প্রতিদিন বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি কবরস্থানও। নদীর আগ্রাসনে সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার হাজারো মানুষ চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহের টানা ভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, দোকানপাট, অসংখ্য গাছপালা এবং শত শত বিঘা আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে। একসময় যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল, সেখানে এখন চারদিকে শুধু ভাঙনের চিহ্ন। স্থানীয়দের দাবি, মাত্র দুই সপ্তাহে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। যেভাবে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে, তাতে আরও শতাধিক পরিবার গৃহহীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
একই অবস্থা চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলেও। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও দোকানপাট নদীতে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের শত শত বিঘা ফসলি জমিও হারিয়ে যাচ্ছে যমুনার স্রোতে।
এদিকে গত ২০ জুন বিকেলে সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়ে। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
ভাঙনের শিকার অনেক পরিবার এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে।
চরগিরিশ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মমিন বলেন, “এই চরে বাবা-দাদার ভিটা ছিল। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই সব নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছি।”
একই গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, “চোখের সামনে সবকিছু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কী খাব—সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।”
চরসলিমাবাদের কোহিনুর খাতুন বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল, সব নদী নিয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা না পেলে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে।”
ষাটোর্ধ্ব রশিদ মিয়া বলেন, “জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি। এখন কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর যমুনার ভাঙন চললেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত থাকলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের।
চরগিরিশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, “আগের ভাঙনে প্রায় ১৫০টি পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। গত দুই সপ্তাহের ভাঙনে আরও অন্তত ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে।”
পানি বৃদ্ধির কারণে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিচু এলাকার কৃষিজমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি ৯ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৩৯ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ১৮৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে কাজ করছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যমুনার পানি বৃদ্ধির কারণে সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালীর কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

