ঢাকা, ১৪ মার্চ: ‘অতি উৎপাদন’ এবং পণ্য উৎপাদনে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ ব্যবহারের অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে কিনা এবং পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে এই তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বুধবার (১১ মার্চ) অতিরিক্ত উৎপাদন বা সক্ষমতার বিষয়ে বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের ওপর তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেয়। পরে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা জানানো হয়।
দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিয়েসন গ্রির জানান, তদন্তে যেসব দেশের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব দেশের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
তিনি বলেন, কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দেখবেন যে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি পণ্য বিক্রি বন্ধে ব্যর্থ হয়ে এসব দেশ মার্কিন ব্যবসার ক্ষতি করছে কিনা।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে যে অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিলেন, জুলাইয়ে সেগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তদন্ত শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই তদন্তের আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের নামও রয়েছে।
ইউএসটিআর জানিয়েছে, তদন্ত শুরুর পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শ শুরু করা হয়েছে এবং তালিকাভুক্ত দেশগুলোর সরকারকে আলোচনার অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি দেশকে আগামী ১৭ মার্চের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে হবে। এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে।
তদন্তে কী দেখা হবে
ইউএসটিআর জানিয়েছে, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার থাকলে সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কেমন—তা তদন্তে পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি এসব নীতি বা চর্চা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা অনুযায়ী কোনো বিদেশি সরকারের নীতি বা কর্মকাণ্ড যদি মার্কিন বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ বিষয়ে এখনো বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান শুক্রবার (১৩ মার্চ) গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তদন্ত শুরু হলেও এতে বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো ঝুঁকি দেখছে না সরকার। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন তালিকায় বাংলাদেশ
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেওয়ার পর বিকল্পভাবে শুল্ক বা কর আরোপের পথ খুঁজতেই এই তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৫ সালের ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পালটা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। তখন বাংলাদেশের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলেও পরে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো হয়।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) স্বাক্ষরিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পালটা শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করায় চুক্তিটি কার্যকর হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত যেসব দেশ থেকে বেশি আমদানি করে, সেসব দেশকেই তদন্তের আওতায় এনেছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাকের বড় রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় তালিকায় এসেছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দেখবে ভর্তুকি, বিশেষ সুবিধা বা সস্তা শ্রমের অপব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখা হচ্ছে কিনা। তেমন প্রমাণ মিললে শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজার অর্থনীতিতে উৎপাদকরা ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে রাখেন, যা স্বাভাবিক। তবে ‘অতি উৎপাদন সক্ষমতা’ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চাপ সৃষ্টি করতেই যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব বলেও মনে করছেন তারা।

