রাজশাহী মহানগরীর ডাবতলার একটি বহুতল ভবনে বিচারকের ভাড়া বাসায় বিচারকপুত্র তৌসিফের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এ সময় বিচারকের স্ত্রীও আহত হয়েছেন। তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থল নগরীর ডাবতলা স্পার্ক ভিউ ভবনে গিয়ে বিচারকের স্বজনদের কেউ আছেন কিনা-জানতে চাইলে কেয়ারটেকার মেসের আলী জানান, ঘটনার পর জজ সাহেবের ফ্ল্যাটটিতে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
ভবনের কেয়ারটেকার আরও বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার কিছুটা পরে একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে এক ব্যক্তি প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে সরাসরি লিফটের দিকে এগিয়ে যায়। এ সময় আমি তাকে বাধা দিই। এ কারণে সে আমার ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়। আপনি কার বাসায় যাবেন-বলতেই সে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করেন।
একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে লিমন অতিথি রেজিস্টার খাতায় স্বাক্ষর করে লিফট দিয়ে পাঁচতলায় জজ স্যারের ফ্ল্যাটে চলে যান। এর আধঘণ্টা পর ফ্ল্যাটের কাজের মেয়ে নিচে এসে আমাকে জানায় স্যারের বাসায় ঘটনা খুব খারাপ। আপনারা তাড়াতাড়ি উপরে চলেন। এ সময় আমি ভবনের লিফট এবং প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়ে উপরে উঠে জজ স্যারের ছেলেকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখি। কিছুটা দূরেই মরার মতো হয়ে পড়ে ছিল সেই লিমন। ঘরের ভেতরে স্যারের সহধর্মিণী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। আশপাশের ফ্ল্যাটের সবাই ছুটে এসে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান কয়েকটি গাড়িতে করে।
এদিকে লিমন মিয়াকে ফ্ল্যাটে যেতে দেওয়ার আগে জজের বাসার কারো অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কিনা- জানতে চাইলে কেয়ারটেকার মেসের আলী বলেন, এই ভবনে এখনো সেই ধরনের কোনো নিয়ম চালু হয়নি। ভবনটিতে এখনো ইন্টারকম লাগানো হয়নি। ফলে কেউ এলে আমরা তাদের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর লিখে দিয়ে চলে যেতে বলি। লিমনও সেভাবেই বিচারকের ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিল। তবে লিমন মিয়াকে আগে আর কখনো জজের বাসায় আসতে দেখিনি।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও তদারকিতে নিয়োজিত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক একটা চিত্র পাওয়া গেছে।
বিচারকের কাজের মেয়েসহ সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র উল্লেখ করে তারা আরও জানান, লিমন মিয়া কলিং বেল দিলে কাজের মেয়েই দরজা খুলে দিয়ে রান্নাঘরে চলে যান। লিমন আসার সময় বিচারকের ছেলে তৌসিফ নিজ ঘরে ঘুমাচ্ছিল।
এ সময় বিচারকের স্ত্রী ঘর থেকে বেরিয়ে দেখেন লিমন মিয়া ডাইনিং রুমের সোফার সামনে দাঁড়িয়ে। ম্যাডাম জানতে চান তুমি এখানে এলে কী করে। এ সময় ম্যাডাম সোফার আরেক কোণায় বসেন। উভয়েই কিছুটা উত্তপ্তভাবে কথাবার্তা বলা শুরু করেন। বিচারকের স্ত্রী এ সময় জোরে লিমন মিয়াকে চুপ করে বসো বলে ঘরের ভেতরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর হঠাৎ করেই লিমন শব্দ করে বলতে থাকেন বেরিয়ে আসেন আপনি বেরিয়ে আসেন। একটা রফাদফা করেই তবে যাব।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, বিচারকের স্ত্রী দরজা খুলছে না দেখে লিমন উদভ্রান্তের মতো দরজায় লাথি মারতে থাকেন। লিমন লাথি মারতে মারতে বলতে থাকেন, আমি বুঝতে পারছি আজ আমাকে আবার পুলিশে ধরিয়ে দিবি তোরা। তোদের কাউকে বাঁচিয়ে রাখব না। একপর্যায়ে জোরে জোরে লাথি দিতে দিতে ঘরের দরজা ভেঙে যায়। লিমন একটা চাকু হাতে নিয়ে বিচারকের স্ত্রীকে আঘাত করার চেষ্টা করে। চিৎকার ও শব্দে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ছেলে তৌসিফ মাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। একপর্যায়ে একটা ওড়না টেনে নিয়ে তৌসিফের গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা করে লিমন। ছেলেকে বাঁচাতে মা এগিয়ে এলে লিমন আবার বিচারকের স্ত্রীকে চাকু দিয়ে আঘাত করতে থাকে।
একপর্যায়ে মা ও ছেলে একযোগে লিমনকে নিবৃত করার চেষ্টা করলে সে মাটিতে পড়ে গিয়ে ছেলের পায়ে ও শরীরে চাকু দিয়ে কয়েকটি আঘাত করে। তৌসিফ অচেতন হয়ে পড়ে যায়। আহত হয়ে সেও অচেতন হয়ে ঘরের ভেতরেই পড়ে। পরে তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে ছেলে তৌসিফকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানান, ঘটনার সময় ধ্বস্তাধস্তি করতে গিয়ে লিমন মিয়ার দুই হাত কিছুটা কেটে রক্ত পড়েছে। তবে সে হাতের ওই চাকুটা জানালা দিয়ে বাহিরে ফেলে দিয়ে মরার ভান করে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। ঘটনার পর সিআইডির ক্রাইম সিনের টিম লিমনের চাকুটি খোঁজার চেষ্টা করেন; কিন্তু ফ্ল্যাটের কোথাও না পেয়ে জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করেন। পরে ভবনের পেছনের দিকের একটা ঝোপ থেকে রক্তাক্ত চাকুটি উদ্ধার করেন আলামত হিসেবে। এই চাকুটি হত্যা মামলার আলামত হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা জব্দ করেছেন।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকাল সোয়া ৩টার দিকে রাজশাহী মহানগরীর ডাবতলার একটি বহুতল ভবনে বিচারকের ভাড়া বাসায় বিচারকপুত্র তৌসিফের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় আহত বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসি (৪৪) ও হামলাকারী লিমন মিয়াও আহত হয়। আহতদের মধ্যে বিচারকপত্নী লুসি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩নং কেবিনে ও হামলাকারী লিমন মিয়া ৪নং ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। লিমন মিয়াকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
এদিকে তৌসিফ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত শুরু হলেও অগ্রগতি বিষয়ে গণমাধ্যমকে কিছু বলার মতো কোনো কিছু এখনো তাদের হাতে আসেনি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিসহ কিছু আলামত জব্দ করেছেন। ভবনের কেয়ারটেকার ও বাসার কাজের মেয়ের কাছ থেকে প্রাথমিক জবানবন্দি নিয়েছেন। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। শুক্রবার সকালে ময়নাতদন্তের আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আসাদুল মরদেহের সুরতহাল প্রস্তুত করেন।

