আমরা চাই আমাদের মৃত্যু দেশে হোক। আমরা মুসলিম, আমরা চাই মৃত্যুর পরে জানাজা হোক। শিয়াল-কুকুরের মতো মরতে চাই না।’—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে আটকা পড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এভাবেই দেশে ফেরার আর্তনাদ জানিয়েছেন জামালপুর সদর উপজেলার গোদাশিমলা এলাকার যুবক আরমান আলী।
ড্রোন কোম্পানি ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকেসহ কয়েকজন বাংলাদেশি যুবককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সম্প্রতি যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে গোপনে ধারণ করা আরমান আলী ও তার সহযোদ্ধা মাইনউদ্দিনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরমান আলী জামালপুর সদর উপজেলার গোদাশিমলা এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে আরমানের বাবা রফিকুল ইসলাম জানান, তার ছেলে বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন।
ভিডিও বার্তায় আবেগঘন কণ্ঠে আরমান বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল ড্রোন কোম্পানিতে ও কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজ দেওয়া হবে। কিন্তু আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকদিন ট্রেনিং করিয়ে সরাসরি ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়। সেখানে চারদিকে মৃত্যু। মাটির নিচে মাইন, উপরে ড্রোন হামলা। আমাদের মাছের টোপের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, তাদের ১৬ সদস্যের ক্যাম্পের ১২ জন ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন। বর্তমানে জীবিত থাকা চারজনই আহত অবস্থায় রয়েছেন।
আরমানের অভিযোগ, আহত হয়ে ক্যাম্পে ফিরে আসার পরও তাদের আবার যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে বাধ্য করা হয়। অস্বীকৃতি জানালে তাদের নির্যাতন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মাটির নিচে বাংকারে আটকে রাখা হয়েছে ৫-৬ দিন। খাবার বা পানিও দেওয়া হয়নি।’
ভিডিওর একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলাদেশ সরকার ও দেশের মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান আরমান।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই জীবন চাইনি। আমরা ছোটখাটো কাজ করে বাঁচতে চেয়েছিলাম। আমার পাঁচ মাসের একটি কন্যাসন্তান আছে। আমরা চাই দেশে ফিরে মরতে, যেন জানাজা হয়। এভাবে মরতে চাই না। আমাদের বাঁচান।’
ভিডিওটি প্রকাশের পর জামালপুরের গোদাশিমলা এলাকায় শোক ও উদ্বেগের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আরমানের পরিবার ও স্বজনরা তার নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য সরকারের জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
আরমানের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দুই দিন আগে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। আমরা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারা বলছে, ওরা নাকি স্বেচ্ছায় চুক্তিতে সই করেছে। অথচ বন্দুক ঠেকিয়ে জোর করে সই নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছেলে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকায় আমরা কেউ স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারছি না। তার মা সারাদিন কান্নাকাটি করে। আরমানের পাঁচ মাসের মেয়ের নাম আরশি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।

