এই শহর বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এখানে নিঃশ্বাস নেওয়ার অর্থ আপনি বিষ নিচ্ছেন। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের বাস্তবতায় ঢাকা ইতিমধ্যেই পরিত্যক্ত শহর হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এই শহরে থাকা মানেই নিজের জীবনকে তিলে তিলে মারা। তবুও জীবন-জীবিকার তাগিদে মানুষকে রাজধানীর বিষাক্ত এই জঙ্গলের নানা ডালপালায় বসে থাকতে হচ্ছে হাড় বেরিয়ে থাকা বানরের মতো।
ঢাকাকে নিয়ে কথাগুলো শুনতে যতই নাটকীয় মনে হোক, বাস্তবতা তার চেয়েও বেশি নির্মম। ২০২৫ সালে ঢাকার বাতাসে সূক্ষ্ম কণিকা PM2.5-এর বার্ষিক গড় ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিকা যেখানে মাত্র ৫ মাইক্রোগ্রাম, সেখানে ঢাকার বাতাস সেই সীমার ১৩.৬ গুণেরও বেশি দূষিত। ওই বছর বিশ্বের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা ছিল তৃতীয় সর্বাধিক দূষিত।
অর্থাৎ আমরা এমন এক শহরে বাস করছি, যেখানে বাতাসকে আর নিছক বাতাস বলা কঠিন। এখানে সকালবেলার হাঁটা, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, অফিসে যাওয়া, স্কুলে যাওয়া—জীবনের স্বাভাবিক কাজগুলোই দীর্ঘমেয়াদে আপনার শরীরের ওপর মরণঘাতী অদৃশ্য ট্যাক্স বসিয়ে দিচ্ছে। PM2.5 এত ক্ষুদ্র যে তা ফুসফুসের গভীরে ঢুকে রক্তপ্রবাহে পৌঁছাতে পারে এবং হৃদরোগ, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, বাংলাদেশে বায়ুদূষণ একাই বিপুল অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী; ২০১৯ সালে বায়ুদূষণের কারণে প্রায় ৭৮ হাজার থেকে ৮৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
আর বিষয়টি শুধু “ঢাকার বাতাস একটু খারাপ”—এত সরল নয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের পরিবেশ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, দুর্বল স্যানিটেশন ও সীসা দূষণ মিলিয়ে বাংলাদেশে বছরে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু ঘটছে এবং অসুস্থতার কারণে হারাচ্ছি প্রায় ৫.২ বিলিয়ন দিন। পরিবেশের এই ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্য ২০১৯ সালে দেশের জিডিপির প্রায় ১৭.৬ শতাংশের সমান ছিল।
তারপর আছে এই শহরের আরেক মহামারী—সময়। ঢাকা এমন একটি শহর, যেখানে মানুষ এই মহামূল্যবান জীবনের অনেকখানি অংশ রাস্তার ওপর রেখে আসে। অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে আপনি যে সময়টুকু রাস্তায় হারান, সেটি শুধু সময় নয়; সেটি ঘুম, পরিবার, বিশ্রাম, পড়াশোনা, সৃজনশীলতা—সবকিছুর কাছ থেকে পই পই করে কেটে নেওয়া সময়। আন্তর্জাতিক ট্রাফিক বিশ্লেষক সংস্থাগুলো, যারা বিশ্বের শত শত শহরের যানজট ও যাতায়াতের সময়কে নিয়মিত পরিমাপ করে, ২০২৫ সালের সূচকেও দেখিয়েছে বিশ্বজুড়ে যানজট আরও বেড়েছে। ঢাকার মতো উচ্চ জনঘনত্বের শহরে এই যানজট কেবল চলাচলের সমস্যা নয়, এটি নগরজীবনের মানের ওপর সরাসরি আঘাত।
ঢাকার আরেকটি অদ্ভুত কৃতিত্ব হচ্ছে—এখানে আপনি কেবল রাস্তাতেই নয়, গরমের মধ্যেও থাকবেন। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু ঢাকায় বেড়েছে ১.৪ ডিগ্রি। আর “যতটা গরম মনে হয়”, সেই সূচকের বৃদ্ধিও জাতীয় গড়ের তুলনায় ঢাকায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। দ্রুত নগরায়ণ, গাছপালা ও সবুজ জায়গা কমে যাওয়া এবং কংক্রিটের বিস্তার এই নগর-উষ্ণায়নকে আরও তীব্র করছে।
ফলে ঢাকার বিপদ শুধু শীতের সকালের ধোঁয়াশা নয়। একই শহরে আপনাকে একই সঙ্গে ধুলা, ধোঁয়া, যানজট, তাপ, জলাবদ্ধতা, শব্দ আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে বসবাস করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বহু বছর ধরেই ঢাকার পানি, বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা বলে আসছে। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটি ঢাকার পানি ও নদীদূষণ কমাতে ৩৭০ মিলিয়ন ডলারের একটি নতুন কর্মসূচি অনুমোদন করেছে—কারণ দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন শহরের বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে।
আর শহর বলতে যেখানে মানুষের একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা থাকার কথা, ঢাকায় সেই জায়গাটুকুও সংকুচিত। পুরোনো এক বিশ্বব্যাংক বিশ্লেষণে ঢাকার সবুজ জায়গা মাথাপিছু মাত্র ৪.৮ বর্গমিটার ছিল এবং ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নির্মিত এলাকার অনুপাতে সবুজ এলাকার অংশও কমেছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতেও ঢাকার বিভিন্ন পরিকল্পনা অঞ্চলে মাথাপিছু খোলা ও সবুজ জায়গার পরিমাণ ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া যায়।
আফসোস আর হতাশার কথা হলেও জানিয়ে রাখি, ব্রিটিশ রাজ, পূর্ববাংলাসহ আরও আদিকাল থেকেই এই অঞ্চলে নগরায়ণ হলেও এত এত বছরেও এই শহরের পয়ঃনিষ্কাশিত বর্জ্য কোনো প্রকার পরিশোধন প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি মিশে বুড়িগঙ্গায়। সেই প্রাণের নদী, যাকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের নগরায়ণ শুরু হয়, সেটির আজ কী অবস্থা তা নিশ্চয়ই কারও অজানা নয়।
তারপরও মানুষ ঢাকা ছাড়ে না। কারণ ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এই দেশের চাকরি, ব্যবসা, প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, গণমাধ্যম, বিনোদন—অসংখ্য সুযোগের কেন্দ্রীভূত ঠিকানা। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার রাজধানী-নগর এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ২০.৩ মিলিয়ন বা ২ কোটি ৩ লাখ।
এই কয়েক কোটির মানুষ কেবল এখানে বসবাস করছে না, তারা একই সঙ্গে প্রতিদিন এই শহরকে টেনে নিয়ে চলছে।
এখানেই ঢাকার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ। যে শহর মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে, সেই শহর থেকেই আবার মানুষ তার জীবিকা খুঁজে নিচ্ছে। যে বাতাস ফুসফুসের জন্য শত্রু, সেই বাতাসেই মানুষ সকাল শুরু করছে। যে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই রাস্তাই তাকে কর্মস্থলে নিয়ে যাচ্ছে। যে শহরের তাপ ক্রমশ অসহনীয় হচ্ছে, সেই শহরের কংক্রিটের দেয়ালের মধ্যেই তাকে ভবিষ্যৎ বানাতে হচ্ছে।
তাই ঢাকা পুরোপুরি “পরিত্যক্ত শহর” হয়ে গেছে—এ কথা আক্ষরিক অর্থে বলা যাবে না। কারণ একটি পরিত্যক্ত শহরে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন জীবনের জন্য লড়াই করে না। কিন্তু একটি শহর কতটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, তার একটি ভয়ংকর উদাহরণ হিসেবে ঢাকাকে দেখার যথেষ্ট কারণ আছে। বাতাসের মান, তাপমাত্রা, জল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট, সবুজের সংকট—সবকিছু একসঙ্গে যখন মানুষের জীবনমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সমস্যাটিকে আর কেবল “নগরীর সমস্যা” বলে পাশ কাটানো যায় না।
সমস্যা হচ্ছে, আমরা এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সকালে AQI দেখি, তারপর বেরিয়ে যাই। রাস্তায় এক ঘণ্টা আটকে থাকি, তারপরও বলি—“ঢাকার ট্রাফিক তো এমনই।” গরমে হাঁপাই, তারপর বলি—“এই বছর একটু বেশি গরম।” রাস্তায় ধুলা খাই, চোখ জ্বলে, কাশি হয়—তারপরও জীবন থেমে থাকে না।
শহরটা আমাদের অসুস্থ করে তুলছে, আর আমরা অসুস্থ হওয়ার মধ্যেই স্বাভাবিক জীবন খুঁজে নিয়েছি।
সম্ভবত এটাই ঢাকার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক।
এখানে মানুষ একদিনে মরছে না। এখানে মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের সুস্থতা, সময়, স্বস্তি আর জীবনের মান রেখে যাচ্ছে। তারপর মাসের শেষে বেতন নিয়ে বাড়ি ফিরছে।
এই শহর তাই শুধু বসবাসের জায়গা নয়—এটি একই সঙ্গে প্রয়োজন, ফাঁদ এবং অভ্যাস।
আর আমরা?
আমরা সেই হাড় বেরিয়ে থাকা বানরের মতোই এখনো রাজধানীর বিষাক্ত এই জঙ্গলের কোনো না কোনো ডালে বসে আছি।
নিচে রাস্তা চলছে।
উপরে ধোঁয়া।
চারপাশে কংক্রিট।
আর আমরা নিঃশ্বাস নিচ্ছি।
কারণ বেঁচে থাকার জন্য আমাদের নিঃশ্বাস নিতেই হবে।
হোক তা বিষাক্ত!
লিখা: নুর রাজু

