জাতীয় সংসদে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের পর এক নজিরবিহীন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা অফিস না করায় থমকে গেছে অভিযোগের তদন্ত, অনুসন্ধান ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের নিষ্পত্তি ঝুলে আছে, যা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ভুক্তভোগীরা।
অধ্যাদেশ বাতিল ও আইনি জটিলতা
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল হয়ে গেছে এবং ২০০৯ সালের পুরনো আইনটি পুনরায় কার্যকর হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অধ্যাদেশটি বাতিলে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় গত ৯ এপ্রিল কমিশন সদস্যরা অনানুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন। সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন,
“অধ্যাদেশ বাতিলের পর কমিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। সঙ্গত কারণেই আমরা আর কার্যালয়ে যাচ্ছি না। এখানে পদত্যাগের কোনো প্রশ্ন নেই।”
খোলা চিঠিতে সদস্যদের উদ্বেগ
সোমবার বিদায়ী চেয়ারম্যান ও চার সদস্য (নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিস) একটি যৌথ খোলা চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা দাবি করেছেন, এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত না হওয়ায় জুলাই অভ্যুত্থানের যোদ্ধারা ভবিষ্যতে মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এছাড়া গুম প্রতিরোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান শিথিল হওয়া এবং কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হয়ে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যাওয়া নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সাবেক কমিশনার নাবিলা ইদ্রিস জানান, যে আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তারা নিয়োগ পেয়েছিলেন, সেটি আর বিদ্যমান না থাকায় তারা সরে এসেছেন।
স্থবিরতা ও ভোগান্তি
কমিশন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলামের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের এই কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর কার্যক্রমে গতি ফিরেছিল। কিন্তু গত সপ্তাহের সংসদীয় সিদ্ধান্তের পর থেকে সব কিছু থমকে গেছে।
তদন্ত কার্যক্রম: অভিযোগের নিয়মিত তদন্ত ও শুনানি বন্ধ রয়েছে।
বকেয়া অভিযোগ: প্রায় ১৫০০-এর বেশি অভিযোগ ঝুলে আছে।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ না থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সমালোচনার মুখে পুরনো আইন
অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে ২০০৯ সালের যে আইনটি ফিরে এসেছে, সেটিকে মানবাধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে ‘পরাধীন ও আজ্ঞাবহ’ আইন হিসেবে সমালোচনা করে আসছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে কমিশনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, নতুন পরিস্থিতিতে তা আবারও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে কমিশনের শূন্যতা কবে পূরণ হবে বা ভুক্তভোগীদের সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি

