ধর্মীয় আলোচক মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী এর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে নতুন করে সামনে এসেছে বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহের বিধান। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে—স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা আইনত বৈধ কি না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতি এবং আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি—দুইটিই গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়েও আগের নিয়ম বহাল রাখা হয়েছে।
হাইকোর্ট কী বলেছে?
২০২২ সালের জানুয়ারিতে একজন আইনজীবী দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতির বিষয়টি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত রাখার বিধান চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেন। ওই রিটে কার্যত মুসলিম পারিবারিক আইনে বহুবিবাহের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল।
তবে ২০২১ সালের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করে দেন। পরে পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১–এর ৬ ধারায় নির্ধারিত আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নেওয়ার প্রক্রিয়া বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়।
আদালতের মতে, এই প্রক্রিয়া নারী ও পুরুষ উভয়ের অধিকার সংরক্ষণ করে এবং কাউন্সিল প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমতি দিতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
দ্বিতীয় বিয়েতে কী কী শর্ত আছে?
সুপ্রিম কোর্টের এর আইনজীবী মিতি সানজানা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য এখনো আগের নিয়মই কার্যকর রয়েছে।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী—
- দ্বিতীয় বিয়ের আগে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি নিতে হবে।
- আবেদন করার সময় বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতির বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে।
- কেন দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তার ব্যাখ্যাও দিতে হবে।
- সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দিতে হবে।
এক্ষেত্রে আবেদন করতে হয় সংশ্লিষ্ট এলাকার চেয়ারম্যানের কাছে। চেয়ারম্যান, আবেদনকারী স্বামী এবং বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় সালিশি পরিষদ বা আরবিট্রেশন কাউন্সিল।
কাউন্সিল যাচাই করবে দ্বিতীয় বিয়ের আবেদন “প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত” কি না। এরপর শর্তযুক্ত বা শর্তহীন অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে কী শাস্তি?
আইনজীবীদের মতে, সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী—
- বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও বকেয়া দেনমোহর তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হবে।
- অর্থ পরিশোধ না হলে তা ভূমি রাজস্বের মতো আদায়যোগ্য হবে।
- এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এছাড়া ফৌজদারি দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪৯৮ ধারাতেও স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ের বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যতিক্রমের সুযোগ আছে কি?
আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রীর সম্মতি না থাকলেও আরবিট্রেশন কাউন্সিল দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি বিবেচনা করতে পারে।
যেমন—
- স্ত্রী বন্ধ্যা হলে
- শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম হলে
- দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকলে
এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনায় কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, “স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে”—এমন প্রচারণা বিভ্রান্তিকর। হাইকোর্টের রায়েও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি এবং বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়াই বহাল রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে এখনো বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নিয়ে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি নেওয়ার বিধান কার্যকর রয়েছে।

