তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই বড় চমক দেখিয়েছে অভিনেতা থালাপতি বিজয়–এর দল টিভিকে। ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও সরকার গঠনের পথে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন তিনি।
ভারতের রাজনৈতিক রীতিতে নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল প্রথমে সরকার গঠনের দাবি জানায় এবং রাজ্যপাল সাধারণত সেই দলকেই সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। পরে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হয়।
এবারের নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। টিভিকে পেয়েছে ১০৮টি আসন। তবে দুটি আসনে জয় পাওয়ায় সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী একটি আসন ছাড়তে হবে বিজয়কে। ফলে কার্যকরভাবে দলের আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৭। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ আসন।
এই পরিস্থিতিতে ৫ আসন পাওয়া ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস টিভিকেকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে দুই দলের সম্মিলিত আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১১২।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই কৌশলগত ভুল করেছেন বিজয়। গত ৬ মে তামিলনাড়ুর গভর্নর রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার–এর কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাতে গিয়ে তিনি শুধু নিজের দলের নয়, কংগ্রেস বিধায়কদের স্বাক্ষরও জমা দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের উচিত ছিল প্রথমে একক বৃহত্তম দল হিসেবে শুধু টিভিকের বিধায়কদের তালিকা জমা দেওয়া। কিন্তু কংগ্রেসের সমর্থনপত্র যুক্ত করায় তিনি কার্যত জোট সরকার গঠনের দাবি করেন। ফলে গভর্নর তাকে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ হিসেবে ১১৮ বিধায়কের সমর্থন দেখাতে বলেছেন।
গভর্নরের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার বৈঠকেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। রাজভবনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন দেখাতে পারেননি বিজয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিত কুমার সিন্ধি সামাজিকমাধ্যম এক্সে মন্তব্য করেন, বিজয় যদি একক বৃহত্তম দলের নেতা হিসেবে দাবি জানাতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
৫১ বছর বয়সী বিজয়ের জন্য এটি প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। স্থানীয় নির্বাচনেও আগে অংশ নেয়নি তার দল টিভিকে। দলটির বিধায়কদের গড় বয়সও তুলনামূলক কম। ফলে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
দলের অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে রয়েছেন প্রবীণ নেতা কে এ সেনগোট্টায়ান। নয়বারের এই বিধায়ক সম্প্রতি অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুন্নেত্র কাঝাগম ছেড়ে বিজয়ের দলে যোগ দেন।
এদিকে গভর্নরের ভূমিকা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের চাপেই গভর্নর এমন অবস্থান নিচ্ছেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও মতভেদ দেখা গেছে। সিনিয়র আইনজীবী নীরজ কিষাণ কউল বলেন, সরকার গঠনের আমন্ত্রণ কাকে জানানো হবে সে বিষয়ে সংবিধানে নির্দিষ্ট কোনো ফর্মুলা নেই। সংবিধানের ১৬৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে গভর্নরের নিজস্ব বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
তিনি সরকারিয়া কমিশন ও পুঞ্চি কমিশনের সুপারিশের কথাও উল্লেখ করেন। সরকারিয়া কমিশন একক বৃহত্তম দলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও পুঞ্চি কমিশন ‘সর্বাধিক সমর্থন পাওয়া’ দল বা জোটকে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
অন্যদিকে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগি ও কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিংভি–এর মতে, একক বৃহত্তম দল হিসেবে বিজয়কেই প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
এরই মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের গুঞ্জনও ছড়িয়েছে। বিজয়কে ঠেকাতে দ্রাবিড়া মুন্নেত্র কাঝাগম ও অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুন্নেত্র কাঝাগম একসঙ্গে আসতে পারে বলেও আলোচনা চলছে। এখন তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক অচলাবস্থা কীভাবে কাটে, সেদিকেই নজর সবার।

