যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর প্রশ্ন উঠেছে—আগেই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি আমদানির চুক্তি থাকার পর আবার নতুন সমঝোতার প্রয়োজন কেন।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এ সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
সমঝোতায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর জ্বালানি সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, বলেন—বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এলপিজি ও এলএনজির বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎসও তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বিশেষ করে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত-এর ওপর নির্ভরতা বেশি। তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। কাতার চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করতে না পারায় বাংলাদেশকে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়া বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। তবে কোনো সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে জ্বালানি কিনতে হলে তা দেশের জন্য ভালো হবে না। সমঝোতার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সমঝোতা অনুযায়ী তেল, গ্যাস, ভূতাপীয় শক্তি ও জৈবশক্তি খাতে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গবেষণা সহযোগিতা সহজ হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এর চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, একক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিকল্প উৎস থাকা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য জরুরি।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি হয়, যেখানে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির বিষয়ে সম্মতি দেয় বাংলাদেশ। এরপরও নতুন এমওইউ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
জ্বালানি বিষয়ক সাময়িকী এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার-এর সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্র আগেই বড় অংশীদার। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন পরিচালনা করছে মার্কিন কোম্পানি Chevron। এছাড়া এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনা ও গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানেও মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন সমঝোতার ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরির দিকে আরও জোর দেবে।

